অভিবাভকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ কি জায়েজ? জানুন

অভিবাভকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ কি জায়েজ? জানুন


 অতি সম্প্রতি আমাদের কেও কয়েক ভাই ব্যক্তিগত ভাবে মেসেন্জারে নক করেছেন যাতে এ বিষয়ে বিস্তারিত ভাবে লিখি।তাই  প্রয়োজন ও জনকৌতুহলের প্রতি লক্ষ্য রেখে এবিষয়ে কুরআন-সুন্নাহের বিস্তারিত বিবরণ নিম্নে তুলে ধরলাম। জাযাকুমুল্লাহ


ইসলামী শরীয়তে এটাই কাম্য যে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ে তার অভিবাভকের অনুমতিক্রমে বিবাহ করবে। একজন প্রকৃত ঈমানদার নারী বা পুরুষ তার পরিবার হতে পালিয়ে বিয়ে করার কথা ভাবতেও পারে না । পরিবার শিরক- কুফরিতে নিমজ্জিত থাকলে ভিন্ন কথা


দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক অভিবাভকের  সম্মতি ছাড়া যদিও বিয়ে করতে পারে, তবে বিবাহের ক্ষেত্রে অভিবাভক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পারিবারিক শান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এটা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এজন্যই ইসলাম বিবাহের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর মতামত  ‘চূড়ান্ত’ হিসাবে সাব্যস্ত করলেও পাশাপাশি অভিবাভকের মতামতকেও সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। 

 রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ ফরমান,


لاَ تُنْكَحُ الأَيِّمُ حَتَّى تُسْتَأْمَرَ ، وَلاَ تُنْكَحُ البِكْرُ حَتَّى تُسْتَأْذَنَ


'' বিধবার বিয়ে তার পরামর্শ ছাড়া এবং কুমারী মেয়ের বিয়ে তার অনুমতি ছাড়া করানো যাবে না।''(বুখারী ৫১৩৬)


অনুরূপভাবে তিনি অভিবাভক কে উদ্দেশ্য করে বলেন,


إِذَا خَطَبَ إِلَيْكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ ، ان لاتَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ عَرِيضٌ


তোমরা যে ছেলের দ্বীনদারি ও চরিত্রের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হতে পার সে যদি প্রস্তাব দেয় তাহলে তার কাছে বিয়ে দাও। যদি তা না কর তাহলে পৃথিবীতে মহা ফেতনা- ফাসাদ সৃষ্টি হবে। (তিরমিযী ১০৮৪)


অতএব যদি পিতা-মাতা জিবীত থাকে তাহলে তাদের অনুমতি ও পরামর্শক্রমে বিবাহ করা উচিৎ। কেননা পিতা-মাতা সন্তানের হকের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী স্নেহশীল ও যত্নবান,এবং কল্যানের ব্যাপারে অবগত। এজন্য তারা নিজেদের স্নেহশীলতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সবচেয়ে ভালো পাত্র/পাত্রি নির্বাচন করবে।


এতদসত্বেও কোনো প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ে যদি তার পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়া দুইজন প্রাপ্ত বয়স্ক সমঝদার সাক্ষ্যির সামনে বিবাহের  প্রস্তাব দেয় এবং অপরপক্ষ তা গ্রহণ করে নেয়, তাহলে ইসলামী শরীয়াহ মুতাবিক বিবাহ শুদ্ধ হয়ে যায়। অভিভাবকের সম্মতি থাকুক বা না থাকুক। অভিভাবক জানুক বা না জানুক। 

এবং তারা পরস্পর বৈধ স্বামী-স্ত্রী বলে বিবেচিত হবে। যদিও পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়া বিবাহ করা শরয়ীভাবে এবং স্বভাবগত ভাবে পসন্দনীয় নয়।


তবে যদি কোনো মেয়ে অভিবাভকের অনুমতি ছাড়া

গায়রে কুফুতে বিবাহ করে, তথা এমন পাত্রকে বিবাহ করে, যার কারণে মেয়ের পারিবারিক সম্মান বিনষ্ট হয়, তাহলে সন্তান হওয়ার আগ পর্যন্ত পিতা সে বিয়ে আদালতের মাধ্যমে ভেঙ্গে দিতে পারবে। তবে যদি কুফুতে বিবাহ করে, তাহলে পিতা এ অধিকারও পাবে না।


আর কুফু বলতে বুঝায় একজন ছেলে ধর্ম,দ্বীনদারি,

সম্পদ,বংশমর্যাদা,পেশা,এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে পাত্রি তথা মেয়ের সমপর্যায়ের হওয়াকে । মেয়ের চেয়ে এসব দিক দিয়ে কম না হওয়া।


আর কুফুর ক্ষেত্রে শুধু পুরুষের দিকটা বিবেচনা করা হয়,মহিলার দিক নয়।অর্থাৎ একজন ছেলে বিবাহের ক্ষেত্রে পূর্বোল্লিখিত বিষয়াবলীতে সমপর্যায়ের হওয়া জরুরি। তবে মেয়ে বিবাহের ক্ষেত্রে ছেলের সমপর্যায়ের হওয়া জরুরি নয়। একজন গরীব/অশিক্ষিত মেয়ে বড় লোকের শিক্ষিত ছেলেকে বিবাহ করতে পারবে।


কুরআনে কারিমে এদিকে ইশারা করে বলা হয়েছে যে,প্রাপ্ত বয়স্ক,জ্ঞানবান মহিলার বিবাহ তার সন্তুষ্টচিত্তে হওয়া উচিৎ।


যদি প্রাপ্ত বয়স্ক,জ্ঞানবান মহিলা উপযুক্ত স্থানে নিজের সন্তুষ্টচিত্তে বিবাহ করে তাহলে অভিবাভকদের জন্য অধিকার নেই শরয়ী কোনো কারণ ছাড়া সেই বিবাহে বাধা দেওয়ার।


 সুরায়ে বাকারাতে ইরশাদ হয়েছে,


{وَاِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاۗءَ فَبَلَغْنَ اَجَلَهُنَّ فَلَا تَعْضُلُوْھُنَّ اَنْ يَّنْكِحْنَ اَزْوَاجَهُنَّ اِذَا تَرَاضَوْا بَيْنَهُمْ بِالْمَعْرُوْفِ ۭ ذٰلِكَ يُوْعَظُ بِهٖ مَنْ كَانَ مِنْكُمْ يُؤْمِنُ بِاللّٰهِ وَالْيَوْمِ الْاٰخِرِ ۭ ذٰلِكُمْ اَزْكٰى لَكُمْ وَاَطْهَرُ ۭ وَاللّٰهُ يَعْلَمُ وَاَنْتُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ} [البقرة: 232]


আর তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দাও এবং তারা তাদের ‘ইদ্দতকাল পূর্ণ করে, এরপর তারা যদি বিধিমত পরম্পর সম্মত হয় , তবে স্ত্রীরা নিজেদের স্বামীদের বিয়ে করতে চাইলে তোমরা তাদেরকে বাধা দিও না। এ দ্বারা তাকে উপদেশ দেয়া হয় তোমাদের মধ্যে যে আল্লাহ্‌ ও আখেরাতে ঈমান রাখে, এটাই তোমাদের জন্য শুদ্ধতম ও পবিত্রতম । আর আল্লাহ্‌ জানেন এবং তোমরা জান না।


এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফতি মুহাম্মদ শফি রহিমাহুল্লাহ লিখেন,

''তালাক প্রাপ্তা মহিলাকে  নিজ সন্তুষ্টিতে বিবাহ করতে শরয়ী কোনো কারণ ছাড়া বাধা দেওয়া হারাম।''


তাই অভিভাবক ব্যতীতও বিবাহ বিশুদ্ধ হয়। হাদিস শরীফে এসেছে,


عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَبَّاسٍ؛ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم، قَالَ: «الْأَيِّمُ أَحَقُّ بِنَفْسِهَا مِنْ وَلِيِّهَا.


হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, মেয়ে তার ব্যক্তিগত বিষয়ে অভিভাবকের চেয়ে অধিক হকদার। {মুয়াত্তা মালিক, হাদীস নং-৮৮৮, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪২১)


حَدَّثَنَا حُسَيْنٌ، حَدَّثَنَا جَرِيرٌ، عَنْ أَيُّوبَ، عَنْ عِكْرِمَةَ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ: ” أَنَّ جَارِيَةً بِكْرًا أَتَتِ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَذَكَرَتْ أَنَّ أَبَاهَا زَوَّجَهَا وَهِيَ كَارِهَةٌ فَخَيَّرَهَا النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ”


হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত। কুমারী মেয়ে রাসূল সাঃ এর কাছে এসে বলল, আমার পিতা আমার অপছন্দ সত্বেও বিয়ে দিয়েছে, তখন রাসূল সাঃ সে মেয়েকে অধিকার দিলেন, [যাকে ইচ্ছে বিয়ে করতে পারে বা এ বিয়ে রাখতেও পারে]। {মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২৪৬৯, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১৮৭৫}


আর যে সকল হাদীস দ্বারা একথা বুঝা যায় যে, অভিভাবক ছাড়া বিয়ে সম্পন্ন হয় না, সেগুলোর অনেকগুলো জবাব মুহাদ্দিসীনে কেরাম ও ফুক্বাহায়ে কেরাম দিয়েছেন।


১.আয়েশা রা.থেকে বর্ণিত বিবাহ বাতিল সংক্রান্ত হাদিসের ব্যাপারে ইমাম বুখারী রহঃ বলেন, হাদীসটি মুনকার। {আলইলালুল কাবীর-২৫৭}


২.অথবা নিষেধের হাদিসগুলোর সম্পর্ক হলো,নাবালেগ, জ্ঞানহীন মেয়ের ক্ষেত্রে।অর্থাৎ তারা যদি অভিভাবক ছাড়া বিবাহ করে তাহলে তা কার্যকর হবে না।


৩.অথবা আয়েশা রা.থেকে বর্ণিত বিবাহ বাতিল সংক্রান্ত হাদিসের জবাব হলো,

أَنَّ عَائِشَةَ، زَوْجَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم، زَوَّجَتْ حَفْصَةَ بِنْتَ عَبْدِ الرَّحْمنِ، الْمُنْذِرَ بْنَ الزُّبَيْرِ. وَعَبْدُ الرَّحْمنِ غَائِبٌ بِالشَّأْمِ.


 অভিভাবক ছাড়া মহিলা কর্তৃক বিয়ে সম্পন্ন না হওয়ার হাদীসটি হযরত আয়শা সিদ্দিকা রাঃ এর। অথচ খোদ আয়শা রা. তার ভাই আব্দুর রহমানের মেয়ে হাফসাকে তার অভিভাবক আব্দুর রহমানকে ছাড়াই নিজে বিয়ে দিয়েছিলেন মুনজির বিন যুবায়েরের সাথে। {মুয়াত্তা মালিক, হাদীস নং-২০৪০, তাহাবী শরীফ, হাদীস নং-৪২৫৫, 


সুতরাং বুঝা গেল যে, উক্ত হাদীস দ্বারা খোদ বর্ণনাকারী হযরত আয়শা রা. নিজেই বিবাহ শুদ্ধ হয় না একথা বুঝেন নি। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, বিয়ে অসম্পূর্ণ হয় অভিভাবক ছাড়া।


কারণ, যে অভিভাবক মেয়েকে লালন পালন করল, তাকে না জানিয়ে বিয়ে করাটাতো অসম্পূর্ণই। তাই বলা হয়েছে তা বাতিল। বাতিল মানে অসম্পূর্ণ।


তাই অভিবাভক ছাড়া বিবাহ করলে তা সহীহ হয়ে যাবে,তবে গাইরে কুফুতে হলে পিতার জন্য আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বাতিল করার অধিকার থাকবে, আর কুফুতে হলে এ অধিকারও পিতার থাকবে না।


"الثيب أحق بنفسها من وليّها، والبكر يستأذنها أبوها في نفسها وإذنها صماتها". (رواه مسلم عن ابن عباس رضي الله عنهما)


 عن أبي سلمة أن أبا هريرة حدّثهم أنّ النبيّ صلى الله عليه وسلم قال : لاتنكح الأيم حتى تستأمر، ولاتنكح البكر حتى تستأذن، قالوا: يا رسول الله وكيف إذنها؟ قال: أن تسكت". (صحیح البخاري)


فتاوی شامی٣/٥٥

"(فنفذ نكاح حرة مكلفة  بلا) رضا (ولي) والأصل أن كل من تصرف في ماله تصرف في نفسه وما لا فلا". (3/ 55، کتاب النکاح ، باب الولی، ط: سعید)


فی الفتاوی الهندیة..

"ثم المرأة إذا زوجت نفسها من غير كفء صح النكاح في ظاهر الرواية عن أبي حنيفة - رحمه الله تعالى -، وهو قول أبي يوسف - رحمه الله تعالى - آخراً، وقول محمد - رحمه الله تعالى - آخراً أيضاً، حتى أن قبل التفريق يثبت فيه حكم الطلاق والظهار والإيلاء والتوارث وغير ذلك، ولكن للأولياء حق الاعتراض ... وفي البزازية: ذكر برهان الأئمة أن الفتوى في جواز النكاح بكراً كانت أو ثيباً على قول الإمام الأعظم، وهذا إذا كان لها ولي، فإن لم يكن صح النكاح اتفاقاً، كذا في النهر الفائق. ولايكون التفريق بذلك إلا عند القاضي أما بدون فسخ القاضي فلاينفسخ النكاح بينهما". (1/ 292، کتاب النکاح، الباب الخامس في الأکفاء فی النکاح، ط: رشیدیة)

 ওলী ছাড়া বিবাহ : শরয়ী দৃষ্টিকোণ

বিবাহের কয়েকটি বিষয় নিয়ে  সমাজে কিছু বিভ্রান্তির ছড়াছড়ি রয়েছে, তন্মধ্যে অন্যতম হলো ‘ওলি ছাড়া বিবাহ শরীয়তে কতটুকু গ্রহণযোগ্য’। ইউটিউবে 

সার্চ করলেই এ বিষয়ে আহলে হাদিস মতাদর্শের আলেমদের ভিডিও চলে আসে, যাতে বলা হচ্ছে অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ বাতিল। আর এ কারণে আমাদের কিছু ভাই-বোনেরা যারা নিজে নিজে বিবাহ করেছেন,তারা  এসব শুনে একটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পতিত হয়ে যান যে আমাদের বিবাহ সহীহ হলো কি না?

Khairul Islam 15/7/2021

Previous Post
Next Post

post written by:

0 Comments: